পরিচিতি
আমরা যারা ২১ শতকে গুরুদেবের গানের সঙ্গে বড় হয়েছি, আর যাদের বাড়ির গীতবিতান এবং স্বরবিতান গুলিতে ঘুণ ধরা সত্ত্বেও যাঁদের রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা কমেনি — এই ওয়েবসাইটটি সেই সমস্ত রবিন্দ্রঅনুরাগিদের জন্য।
নেটে গীতবিতানের একাধিক সাইট থাকলেও, একটি ডিজিটাল-ফার্স্ট আর্কাইভ-এর অভাব। gitabitan.io সেই অভাবের পূরক। gitabitan.io-র অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর আধুনিক, সহজে-ব্যবহারযোগ্য এবং অত্যন্ত দ্রুত ইন্টারফেস। সার্চ বক্সে (কীবোর্ড শর্টকাট ⌘K দিয়ে অ্যাকটিভেট হয়) যেকোনো গানের বাংলা বা ইংরেজি কথা টাইপ করলে সেই আদ্যক্ষরবিশিষ্ট গানের তালিকা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে আপনার পছন্দমতো গান সংক্রান্ত বহু তথ্য (যথা রচনার স্থান, কাল, রাগ, তাল, পরিবেশ, অনুবাদ, প্রতিকৃতি, আঁকা ছবি, সঙ্গীত নিয়ে কবির এবং কবিঅনুরাগীদের রচনাসম্ভার থেকে উদ্ধৃতি) পেতে পারবেন।
gitabitan.io-র আরেকটি অভিনব বৈশিষ্ট্য হলো যে এখানে 1800-রও বেশি ডিজিটাল স্বরলিপিও দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গানের সঙ্গেই রয়েছে একটি স্বরলিপি প্লেয়ার। প্লে বাটন ক্লিক করলেই তালসঙ্গত স্বারালিপিটির উপস্থাপনা শোনা যাবে। যাঁরা স্টাফ নোটেশন পড়তে দক্ষ, তাঁদের জন্য আকারমাত্রিক স্বারালিপির সাথে স্টাফ নোটেশন ডাউনলোড করার সুবিধেও রইল।
আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা বা রেকর্ডিং করার জন্য যে বাদ্যযন্ত্রের ট্র্যাকের প্রয়োজন, সেটিরও সুদ্ধ স্বরলিপিভিত্তিক ট্র্যাক ডাউনলোড করার সুবিধে রইল।
gitabitan.io-র মুল লক্ষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গীত-প্রতিভার একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, সহজে-ব্যবহারযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা। এই প্রয়াসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য — প্রতিটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের নির্ভুল পরিবেশনার একটি সংগ্রহ তৈরি করা। এখন গানের রেকর্ডিং ট্যাবে উপল দাস, নমিতা দাস, প্রফুল্ল কুমার দাস, শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও সুরঙ্গমা গোষ্ঠীর কণ্ঠে গাওয়া কয়েকটি গান শুনতে পাবেন; তবে যদি আপনাদের মধ্যে কেউ এই উদেশ্যের প্রতি অবদান করতে চান, তবে এই ফর্মটি ভরে, আপনি আপনার গাওয়া গান আমাদের পাঠাতে পারেন।
AI'র যুগেও গুরুদেবের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। গুরুদেবকে আর আমার পরিবার যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ধারা বহন করে এসেছে, শ্রদ্ধা জানাতেই এই প্রকল্পের শুরু। সবকিছুর শুরু হয়েছিল একটি বিয়ে থেকে — আমার ঠাম্মা (৺নমিতা দাস) দাস পরিবারে বিয়ে করে আসেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। বেঙ্গল মিউজিক কলেজ থেকে তিনি বি.মিউজ. ডিগ্রি পেয়েছিলেন।
আমার ঠাম্মার মামা — ৺প্রফুল্ল কুমার দাস — তাঁর সময়ের অন্যতম বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষক, শিল্পী ও গবেষক ছিলেন। তিনি শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে তালিম নিয়েছিলেন। গীতবিতানের বহু গানের স্বরলিপিও তিনি তৈরি ও সম্পাদনা করেছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সুরঙ্গমার অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুরঙ্গমা — রবীন্দ্রসঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার একটি শিক্ষায়তন — প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালের ১৬ই আগস্ট, নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম কৃতী শিষ্য ৺শৈলজারঞ্জন মজুমদারের প্রয়াসে; সঙ্গে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে ছিলেন ৺প্রভাস নিয়োগী, ৺নীলিমা সেন, ৺দেবজ্যোতি দত্ত মজুমদার ও ৺প্রসাদ সেনের মতো বিশিষ্টজনেরা। শরৎ বসু অ্যাকাডেমি-র উদ্যোগে কলকাতার নেতাজি ভবনে সুরঙ্গমার উদ্বোধন-অনুষ্ঠান হয়েছিল।
আমার পরিবারে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার পূর্ণতা পেয়েছিল আমার বাবা-মায়ের হাতে — বাবা ৺উপল দাস ও মা ৺গোপা দাস দুজনেই সুরঙ্গমা থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেছিলেন। যদিও মা সঙ্গীতচর্চা আর খুব বেশি এগিয়ে নিয়ে যাননি, কিন্তু বাবা ছিলেন এক অত্যন্ত কৃতী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষক ও শিল্পী। বহু বছর তিনি সুরঙ্গমায় শিক্ষকতা করেছিলেন। সুরঙ্গমায় তিনি অনেক নৃত্যনাট্য ও গীতিনাট্যরও পরিচালনা করেছিলেন; তাঁর পরিচালিত দলগত ও একক পরিবেশনা — দুই-ই gitabitan.io-তে পাওয়া যাবে।
আমার ঠাম্মা ও বাবার কাছে গান শেখা দিয়েই রবীন্দ্রনাথের রচনা এবং রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি আমার ভালোবাসার সূচনা। ছেলেবেলার দিনগুলি থেকেই রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে — জীবনের নানা টানাপোড়েনের সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত বারবার হয়ে উঠেছে প্রয়োজনীয় আশ্রয়। পরিবারের কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীতের যে আনন্দ আমি উত্তরধিকারসূত্রে পেয়েছি, gitabitan.io-র মাধ্যমে সেই আনন্দ ও ভালোবাসা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই আমার অভিপ্রায়।