গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য / তাসের দেশ

তাসের দেশ

Tasher Desh

নাটক 1933 10টি গান

গানে বোনা ব্যঙ্গনাট্য — জাহাজডুবি রাজপুত্র এসে পড়েন নিয়মে বাঁধা তাসের দেশে; মুক্তির গানে তাসের ছক ভেঙে পড়ে। ১৯৩৯-এর সংস্করণ সুভাষচন্দ্র বসুকে উৎসর্গিত।

সূচি

চরিত্র

  • রাজপুত্র
  • সদাগর
  • পত্রলেখা
  • রাজা
  • রানী
  • ছক্কা
  • পঞ্জা
  • গোলাম
  • টেক্কানী
  • ইস্কাবনী
  • হরতনী
  • চিঁড়েতনী
  • রুইতন
  • দহলা
  • দহলানী
  • তাসের দল

উৎসর্গ

কল্যাণীয় শ্রীমান সুভাষচন্দ্র, স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম। শান্তিনিকেতন                        রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাঘ ১৩৪৫

খরবায়ু বয় বেগে, Kharobayu boy bege গানটি দেখুন
খরবায়ু বয় বেগে,  চারি দিক ছায় মেঘে,

         ওগো
নেয়ে, নাওখানি বাইয়ো।

তুমি কষে ধরো হাল,   আমি তুলে বাঁধি পাল–

হাঁই মারো, মারো টান হাঁইয়ো॥

     শৃঙ্খলে বারবার ঝন্ঝন্
ঝঙ্কার  নয় এ তো তরণীর ত্রন্দন শঙ্কার–

     বন্ধন দুর্বার সহ্য না হয়
আর,  টলোমলো করে আজ তাই ও।

    হাঁই মারো, মারো টান হাঁইয়ো॥

গণি গণি দিন খন  চঞ্চল করি মন

বোলো না ‘যাই কি নাই যাই রে’।

সংশয়পারাবার  অন্তরে হবে পার,

উদ্‍বেগে তাকায়ো না বাইরে।

     যদি মাতে মহাকাল, উদ্দাম
জটাজাল  ঝড়ে হয় লুন্ঠিত, ঢেউ উঠে উত্তাল,

     হোয়ো নাকো কুন্ঠিত, তালে তার
দিয়ো তাল–জয়-জয় জয়গান গাইয়ো।

হাঁই মারো, মারো টান হাঁইয়ো॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Kharobaayu boy bege,    chaaridik chhaay meghe,
Ogo neye, naaokhani baaiyo.
Tumi koshe dharo haal,   aami tule bnaadhi paal -
Hnaai maaro maaro taan hnaaiyo.
Shrinkhale baarbar jhaanjhano jhaankar,   noy e to taronir krandono shankaar -
Bandhano durbar sojhyo na hoy aar, talomalo kare aaj taai o.
Hnaai maaro maaro taan hnaaiyo.
Goni goni din khan    chanchalo kori mon
Bolo na, 'Jaai ki naai jaai re'.
Sangshoypaarabar    antare habe paar,
Udbege taakayo na baaire.
Jodi maate mahakaal, uddaam jatajaal jhare hoy luntthito dheu utthe uttal,
Hoyo naako kuntthito, tale taar diyo taal -   joy joy joygaan gaaiyo.
Hnaai maaro maaro taan hnaaiyo.

রাজপুত্রআর তো চলছে না, বন্ধু।

সদাগরকিসের চাঞ্চল্য তোমার, রাজকুমার।

রাজপুত্রকেমন করে বলব। কিসের চাঞ্চল্য বলো দেখি ঐ হাঁসের দলের, বসন্তে যারা ঝাঁকে ঝাঁকে চলেছে হিমালয়ের দিকে।

সদাগরসেখানে যে ওদের বাসা।

রাজপুত্রবাসা যদি, তবে ছেড়ে আসে কেন। না না, ওড়বার আনন্দ, অকারণ আনন্দ।

সদাগরতুমি উড়তে চাও?

রাজপুত্রচাই বৈকি।

সদাগরবুঝতেই পারি নে তোমার কথা। আমি তো বলি অকারণ ওড়ার চেয়ে সকারণ খাঁচায় বন্ধ থাকাও ভালো।

রাজপুত্রসকারণ বলছ কেন।

সদাগরআমরা-যে সোনার খাঁচায় থাকি শিকলে বাঁধা দানাপানির লোভে।

রাজপুত্রতুমি বুঝতে পারবে না, বুঝতে পারবে না।

সদাগরআমার ও দোষটা আছে, যা বোঝা যায় না তা আমি বুঝতেই পারি নে। একটু স্পষ্ট করেই বলো-না, কী তোমার অসহ্য হল।

রাজপুত্ররাজবাড়ির এই একঘেয়ে দিনগুলো।

সদাগরএকঘেয়ে বল তাকে? কতরকম আয়োজন, কত উপকরণ।

রাজপুত্রনিজেকে মনে হয় যেন সোনার মন্দিরে পাথরের দেবতা। কানের কাছে কেবল একই আওয়াজে বাজছে শঙ্খ কাঁসর ঘণ্টা। নৈবেদ্যের বাঁধা বরাদ্দ, কিন্তু ভোগে রুচি নেই। এ কি সহ্য হয়।

সদাগরআমাদের মতো লোকের তো খুবই সহ্য হয়। ভাগ্যিস বাঁধা বরাদ্দ। বাঁধন ছিঁড়লেই তো মাথায় হাত দিয়ে পড়তে হয়। যা পাই তাতেই আমাদের ক্ষুধা মেটে। আর, যা পাও না তাই দিয়েই তোমরা মনে মনে ক্ষুধা মেটাতে চাও।

রাজপুত্রআর, রোজ রোজ ঐ-যে চারণদের স্তব শুনতে হয় একই বাঁধা ছন্দে— সেই শার্দুলবিক্রীড়িত।

সদাগরআমার তো মনে হয়, স্তব জিনিসটা বারবার যতই শোনা যায় ততই লাগে ভালো। কিছুতেই পুরোনো হয় না!

রাজপুত্রঘুম ভাঙতেই সেই এক বৈতালিকের দল। আর, রোজ সকালে সেই এক পুরুতঠাকুরের ধান দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ। আর আসতে যেতে দেখি, সেই বুড়ো কঞ্চুকীটা কাঠের পুতুলের মতো খাড়া দাঁড়িয়ে আছে দরজার পাশে। কোথাও যাবার জন্যে একটু পা বাড়িয়েছি কি অমনি কোথা থেকে প্রতিহারী এসে হাজির, বলে— ইত ইতৌ, ইত ইতৌ, ইত ইতৌ। সব্বাই মিলে মনটাকে যেন বুলি-চাপা দিয়ে রেখেছে।

সদাগরকেন, মাঝে মাঝে যখন শিকারে যাও তখন বুনোজন্তু ছাড়া আর-কোনো উৎপাত তো থাকে না।

রাজপুত্রবুনোজন্তু বলো কাকে। আমার তো সন্দেহ হয়, রাজশিকারী বাঘগুলোকে আফিম খাইয়ে রাখে। ওরা যেন অহিংস্রনীতির দীক্ষা নিয়েছে। এ পর্যন্ত একটাকেও তো ভদ্ররকম লাফ মারতে দেখলুম না।

সদাগরযাই বল, বাঘের এই আচরণকে আমি তো অসৌজন্য ব’লে মনে করি নে। শিকারে যাবার ধুমধামটা সম্পূর্ণই থাকে, কেবল বুক দুর্দুর্ করে না।

রাজপুত্রসেদিন ভালুকটাকে বহুদূর থেকে তীর বিঁধেছিলুম, তা নিয়ে চার দিক থেকে ধন্য-ধন্য পড়ে গেল; বললে, রাজপুত্রের লক্ষ্যভেদের কী নৈপুণ্য! তার পরে কানাকানিতে শুনলুম, একটা মরা ভালুকের চামড়ার মধ্যে খড়বিচিলি ভরে দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিল। এত বড়ো পরিহাস সহ্য করতে পারি নি। শিকারীকে কারাদণ্ডের আদেশ করে দিয়েছি।

সদাগরতার উপকার করেছ। তার সে কারাগারটা রানীমার অন্দরমহলের সংলগ্ন, সে দিব্যি সুখে আছে। এই তো সেদিন, তার জন্য তিন মন ঘি আর তেত্রিশটা পাঁঠা পাঠিয়ে দিয়েছি আমাদের গদি থেকে।

রাজপুত্রএর অর্থ কী।

সদাগরসে ভালুকটার সৃষ্টি যে রানীমারই আদেশে।

রাজপুত্রঐ তো। আমরা পড়েছি অসত্যের বেড়াজালে। নিরাপদের খাঁচায় থেকে থেকে আমাদের ডানা আড়ষ্ট হয়ে গেল। আগাগোড়া সবই অভিনয়। আমাকে যুবরাজী সঙ বানিয়েছে। আমার এই রাজসাজ ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ঐ-যে ফসলখেতে ওদের চাষ করতে দেখি, আর ভাবি, পূর্বপুরুষের পুণ্যে ওরা জন্মেছে চাষী হয়ে।

সদাগরআর, ওরা তোমার কথা কী ভাবে সে ওদের জিজ্ঞাসা করে দেখো দেখি। রাজপুত্র, তুমি কী সব বাজে কথা বলছ— মনের আসল কথাটা লুকিয়েছ। ওগো পত্রলেখা, আমাদের রাজপুত্রের গোপন কথাটি হয়তো তুমিই আন্দাজ করতে পারবে, একবার সুধিয়ে দেখো-না।

পত্রলেখার প্রবেশ

গান

গোপন কথাটি রবে না গোপনে Gopono kathati rabe গানটি দেখুন
গোপন কথাটি রবে না গোপনে,

উঠিল ফুটিয়া নীরব নয়নে।

না না না,   রবে না গোপনে॥

বিভল হাসিতে

বাজিল বাঁশিতে,

স্ফুরিল অধরে নিভৃত স্বপনে।

না না না,   রবে না গোপনে॥

মধুপ গুঞ্জরিল,

     মধুর বেদনায় আলোকপিয়াসি

অশোক মুঞ্জরিল।

হৃদয়শতদল

করিছে টলমল

অরুণ প্রভাতে করুণ তপনে।

না না না,   রবে না গোপনে॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Gopano kathati rabe na gopane,
Utthilo phutiya nirabo nayone -
Na na na, rabe na gopane.
Bibhalo haasite
Baajilo bnaashite,
Sphurilo adhore nibhrito swapone -
Na na na, robe na gopone.
Modhupo gunjorilo,
Modhuro bedonay aaloko-piyasi
Ashoko munjorilo.
Hridoyoshatodalo
Korichhe talomolo
Orun probhate koruno tapone -
Na na na, robe na gopone.

রাজপুত্রআছে আমার গোপন কথা, সে কথাটা গোপন রয়েছে দূরের আকাশে। সমুদ্রের ধারে বসে থাকি পশ্চিম দিগন্তের দিকে চেয়ে। সেইখানে আমার অদৃষ্ট যা যক্ষের ধনের মতো গোপন করে রেখেছে যাব তারই সন্ধানে।

যাবই আমি যাবই ওগো Jaboi ami jaboi ogo গানটি দেখুন
যাবই আমি যাবই ওগো,   বাণিজ্যেতে যাবই।

লক্ষ্মীরে হারাবই যদি, অলক্ষ্মীরে পাবই॥

সাজিয়ে নিয়ে জাহাজখানি বসিয়ে হাজার দাঁড়ি

কোন্ পুরীতে যাব দিয়ে কোন্ সাগরে পাড়ি।

কোন্ তারকা লক্ষ্য করি  কূলকিনারা পরিহরি

কোন্ দিকে যে বাইব তরী  বিরাট কালো নীরে–

মরব না আর ব্যর্থ আশায় সোনার বালুর তীরে॥

নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা।

শৈলচূড়ায় নীড় বেঁধেছে সাগর-বিহঙ্গেরা।

নারিকেলের শাখে শাখে  ঝোড়ো বাতাস কেবল ডাকে,

ঘন বনের ফাঁকে ফাঁকে  বইছে নগনদী।

সাত-রাজার ধন মানিক পাব সেথায় নামি যদি॥

হেরো  সাগর ওঠে তরঙ্গিয়া, বাতাস বহে বেগে।

সূর্য যেথায় অস্তে নামে ঝিলিক মারে মেঘে।

দক্ষিণে চাই, উত্তরে চাই–ফেনায় ফেনা, আর কিছু নাই–

যদি কোথাও কূল নাহি পাই  তল পাব তো তবু–

ভিটার কোণে হতাশমনে রইব না আর কভু॥

অকূল-মাঝে ভাসিয়ে তরী যাচ্ছি অজানায়

আমি শুধু একলা নেয়ে আমার শূন্য নায়।

নব নব পবন-ভরে  যাব দ্বীপে দ্বীপান্তরে,

নেব তরী পূর্ণ করে  অপূর্ব ধন যত।

ভিখারি মন ফিরবে যখন ফিরবে রাজার মতো॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Jaaboi aami jaaboi ogo,
Baanijyete jaaboi.
Lokkhire haaraboi jodi,
Alokkhire paaboi.
Saajiye niye jaahajkhaani
Bosiye haajar dnaari
Kon purite jaabo niye
Kon saagore paari.
Kon taaroka lokkho kori
Kulkinara porihori
Kon dike je baaibo tori
Birat kaalo nire -
Morbo na aar byartho aashay
Sonar baalur tire.
Niler kole shyamol se dwip
Probal diye ghera.
Shoilachuray nir bnedhechhe
Saagorbihongera.

Naarikeler shaakhe shaakhe
Jhoro baatas kebol daake,
Ghano boner phnaake phnaake
Boichhe nagonodi.
Saat raajar dhon maanik paabo
Sethay naami jodi.

Hero saagor utthe tarongiya,
Baatas bohe bege.
Surjo jethay aste naame
Jhilik maare meghe.
Dokkhine chaai uttore chaai –
Phenay phena, aar kichhu naai –
Jodi kothao kul naahi paai
Tol paabo to tobu –
Bhitar kone hatashmone
Roibo na aar kobhu.
Akul-maajhe bhaasiye tori
Jaachhi ajanay
Aami shidhu ekla neye
Aamar shunyo naay.
Nabo nabo pabon-bhore
Jaabo dwipe dwipantare,
Nebo tori purno kore
Apurbo dhan jato –
Bhikhari mon phirbe jakhon
Phirbe raajar mato.

রাজপুত্রনবীনা! নবীনা!

সদাগরনবীনা! এতক্ষণে একটা স্পষ্ট কথা পাওয়া গেল।

রাজপুত্রস্পষ্ট হয়ে রূপ নিতে এখনো দেরি আছে।

মা। বাছা, তোমাকে ধরে রাখতে গেলেই হারাব। তুমি বইতে পারবে না আরামের বোঝা, সইতে পারবে না সেবার  বন্ধন।  আমি ভয়  ক’রে  অকল্যাণ  করব না।  ললাটে  দেব  শ্বেতচন্দনের তিলক,  শ্বেত  উষ্ণীষে  পরাব শ্বেতকরবীর গুচ্ছ। যাই কুলদেবতার পুজো সাজাতে। সন্ধ্যার সময় আরতির কাজল পরাব চোখে। পথে দৃষ্টির বাধা যাবে কেটে।

[ রাজমাতার প্রস্থান

আমার মন বলে, ‘চাই, চা ই, চাই গো (তোমার আমার মন বলে) amara mana vale chai cha i chai go tomara amara mana vale গানটি দেখুন
আমার     মন বলে, ‘চাই, চা ই, চাই
গো–যারে নাহি পাই গো’।

    সকল  পাওয়ার
মাঝে   আমার   মনে বেদন বাজে–

‘নাই, না ই, নাই গো’॥

হারিয়ে যেতে হবে,

আমায়   ফিরিয়ে পাব তবে।

সন্ধ্যাতারা যায় যে
চলে      ভোরের তারায় জাগবে
ব’লে–

 বলে সে ‘যা ই, যা ই, যাই গো’॥

রাজপুত্রএক ডাঙা থেকে দিলেম পাড়ি, তরী ডুবল মাঝ সমুদ্রে, ভেসে উঠলেম আর-এক ডাঙায়। এতদিন পরে মনে হচ্ছে, জীবনে নতুন পর্ব শুরু হল।

সদাগররাজপুত্র, তুমি তো কেবলই নতুন নতুন করে অস্থির হলে। আমি ভয় করি ঐ নতুনকেই। যাই বল, বন্ধু, পুরোনোটা আরামের।

রাজপুত্রব্যাঙের আরাম এঁদো কুয়োর মধ্যে। এটা বুঝলে না, উঠে এসেছি মরণের তলা থেকে। যম আমাদের ললাটে নতুন জীবনের তিলক পরিয়ে দিলেন।

সদাগররাজতিলক তোমার ললাটে তো নিয়েই এসেছ জন্মমুহূর্তে।

রাজপুত্রসে তো অদৃষ্টের ভিক্ষেদানের ছাপ। যমরাজ মহাসমুদ্রের জলে সেটা কপাল থেকে মুছে দিয়ে হুকুম করেছেন, নতুন রাজ্য নতুন শক্তিতে জয় করে নিতে হবে, নতুন দেশে।–

গান

এলেম নতুন দেশ তলায় গেল ভগ্ন তরী, কূলে এলেম ভেসে।

অচিন মনের ভাষা শোনাবে অপূর্ব কোন্ আশা, বোনাবে রঙিন সুতোয় দুঃখসুখের জাল, বাজবে প্রাণে নতুন গানের তাল, নতুন বেদনায় ফিরব কেঁদে হেসে।

নাম-না-জানা প্রিয়া নাম-না-জানা ফুলের মালা নিয়া হিয়ায় দেবে হিয়া।

যৌবনেরি নবোচ্ছ্বাসে ফাগুনমাসে বাজবে নূপুর ঘাসে ঘাসে, মাতবে দখিনবায় মঞ্জরিত লবঙ্গলতায় চঞ্চলিত এলোকেশে॥

সদাগররাজপুত্র, তোমার গানের সুরে কথাটা শোনাচ্ছে ভালো। কিন্তু, জিজ্ঞাসা করি, এ দেশে যৌবনের নবীন রূপ দেখলে কোথায়। চারি দিকটা তো একবার ঘুরে এসেছি। দেখে মনে হল, যেন ছুতোরের তৈরি কাঠের কুঞ্জবন। দেখলুম, ওরা চৌকো চৌকো কেঠো চালে চলেছে, বুকে পিঠে চ্যাপটা, পা ফেলছে খিট্খুট্ খিট্খুট্ শব্দে, বোধ করি চৌকুনি নূপুর পরেছে পায়ে, তৈরি সেটা তেঁতুল কাঠে। এই মরা দেশকে কি বলে নতুন দেশ।

রাজপুত্রএর থেকেই বুঝবে, জিনিসটা সত্যি নয়, এটা বানানো, এটা উপর থেকে চাপানো, এদের দেশের পণ্ডিতদের হাতে গড়া খোলস। আমরা এসেছি কী করতে— খসিয়ে দেব। ভিতর থেকে প্রাণের কাঁচা রূপ যখন বেরিয়ে পড়বে, আশ্চর্য করে দেবে।

সদাগরআমরা সদাগর মানুষ, যা পষ্ট দেখি তার থেকেই দর যাচাই করি। আর, যা দেখতে পাও না তারই উপর তোমাদের বিশ্বাস। আচ্ছা, দেখা যাক, ছাইয়ের মধ্যে থেকে আগুন বেরোয় কি না। আমার তো মনে হয়, ফুঁ দিতে দিতে দম ফুরিয়ে যাবে। ঐ দেখো-না, এই দিকেই আসছে— এ যেন মরা দেহে ভূতের নৃত্য।

রাজপুত্রএকটু সরে দাঁড়ানো যাক। দেখি-না কাণ্ডটা কী।

পঞ্জাজান না, চালটা অতি প্রাচীন, চলনটাই আধুনিক, অপোগণ্ড, অর্বাচীন, অজাতশ্মশ্রু।

ছক্কাগুরুমশায়ের হাতে মানুষ হও নি। কেউ বুঝিয়ে দেয় নি, রাস্তায় ঘাটে খানা আছে, ডোবা আছে, কাঁটা আছে, খোঁচা আছে— চলন জিনিসটার আপদ বিস্তর।

রাজপুত্রএ দেশটা তো গুরুমশায়েরই দেশ। শরণ নেব তাঁদের।

ছক্কাএবার তোমাদের পরিচয়টা?

রাজপুত্রআমরা বিদেশী।

পঞ্জাবাস্। আর, বলতে হবে না। তার মানে, তোমাদের জাত নেই, কুল নেই, গোত্র নেই, গাঁই নেই, ঞ্জাত নেই, গুষ্টি নেই, শ্রেণী নেই, পঙ্ক্তি নেই।

রাজপুত্রকিছু নেই, কিছু নেই— সব বাদ দিয়ে এই যা আছে, দেখছই তো। এখন তোমাদের পরিচয়টা?

ছক্কাআমরা ভুবনবিখ্যাত তাসবংশীয়। আমি ছক্কা শর্মণ।

পঞ্জাআমি পঞ্জা বর্মণ।

পঞ্জাকী আর হবে, শুচি থাকলে শুচি হয়। বুঝতে পারছ না?

রাজপুত্রআমাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, ঐ পাড়ির উপরে কী করছিলে দল বেঁধে।

ছক্কাযুদ্ধ।

রাজপুত্রতাকে বলে যুদ্ধ?

পঞ্জানিশ্চয়! অতি বিশুদ্ধ নিয়মে। তাসবংশোচিত আচার-অনুসারে।

গান

আমরা চিত্র, অতি বিচিত্র, অতি বিশুদ্ধ, অতি পবিত্র।

সদাগরতা হোক। যুদ্ধে একটু রাগারাগি না হলে রস থাকে না।

ছক্কাআমাদের রাগ রঙে।

আমাদের যুদ্ধ—

নহে কেহ ক্রুদ্ধ, ওই দেখো গোলাম অতিশয় মোলাম।

সদাগরতা হোক্-না, তবু কামান-বন্দুকটা যুদ্ধক্ষেত্রে মানায় ভালো।

পঞ্জানাহি কোনো অস্ত্র, খাকি-রাঙা বস্ত্র।

রাজপুত্রনাই রইল, তবু একটা নালিশ থাকা চাই তো। তাই নিয়েই তো দুই পক্ষে লড়াই।

ছক্কা

যথারীতি জানি সেইমতে মানি, কে তোমার শত্রু, কে তোমার মিত্র, কে তোমার টক্কা, কে তোমার ফক্কা।

পঞ্জাওহে বিদেশী, শাস্ত্রমতে তোমাদেরও তো একটা উৎপত্তি ঘটেছিল?

সদাগরনিশ্চিত। পিতামহ ব্রহ্মা সৃষ্টির গোড়াতেই সূর্যকে সেই শানে চড়িয়েছেন অমনি তাঁর নাকের মধ্যে ঢুকে পড়ল একটা আগুনের স্ফুলিঙ্গ। তিনি কামানের মতো আওয়াজ ক’রে হেঁচে ফেললেন— সেই বিশ্ব-কাঁপানি হাঁচি থেকেই আমাদের উৎপত্তি।

ছক্কাএখন বোঝা গেল! তাই এত চঞ্চল!

রাজপুত্রস্থির থাকতে পারি নে, ছিটকে ছিটকে পড়ি।

পঞ্জাসেটা তো ভালো নয়।

সদাগরকে বলছে ভালো। আদিযুগের সেই হাঁচির তাড়া আজও সামলাতে পারছি নে।

ছক্কাএকটা ভালো ফল দেখতে পাচ্ছি— এই হাঁচির তাড়ায় তোমরা সকাল-সকাল এই দ্বীপ থেকে ছিটকে পড়বে, টিঁকতে পারবে না।

ছক্কাওহে ভাই পঞ্জা, একেবারে অসবর্ণ। কী জাতি তোমরা।

সদাগরআমরা নাশক, নাসা থেকে উৎপন্ন।

পঞ্জাকোনো উচ্চবংশীয় জাতির অমনতরো নাম তো শুনি নি।

সদাগরহাইয়ের বাষ্পে তোমরা উড়ে গেছ উচ্চে, পরলোকের পারে; হাঁচির চোটে আমরা পড়েছি নীচে, এই ইহলোকের ধারে।

ছক্কাপিতামহের নাসিকার অসংযমবশতই তোমরা এমন অদ্ভুত।

রাজপুত্রএতক্ষণে ঠিক কথাটাই বেরিয়েছে তোমার মুখ থেকে, আমরা অদ্ভুত।

গান

আমরা নূতন যৌবনেরই দূত Amra nuton joubaneri dut গানটি দেখুন
আমরা নূতন যৌবনেরই দূত।

আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত।

আমরা বেড়া ভাঙি,

আমরা  অশোকবনের রাঙা নেশায় রাঙি।

ঝঞ্ঝার বন্ধন ছিন্ন করে দিই– আমরা বিদ্যুৎ॥

আমরা করি ভুল –

অগাধ জলে ঝাঁপ দিয়ে যুঝিয়ে পাই কূল।

   যেখানে ডাক পড়ে
জীবন-মরণ-ঝড়ে    আমরা প্রস্তুত॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Aamra nutan jauboneri  dut
Aamra chanchal aamra adbhut.
Aamra bera bhaangi,
Aamra ashokboner raanga neshay raangi,
Jhanjharo bandhono chhinno kore dei -   aamra bidyut.
Aamra kori bhul -
Agaadh jale jhnaap diye jujhiye paai kul.
Jekhane daak pare jiban maron jhare aamra prostut.

ছক্কা-পঞ্জা। (পরস্পর মুখ চেয়ে) এ চলবে না, এ চলবে না।

রাজপুত্রযা চলবে না তাকেই আমরা চালাই।

ছক্কাকিন্তু, নিয়ম!

রাজপুত্রবেড়ার নিয়ম ভাঙলেই পথের নিয়ম আপনিই বেরিয়ে পড়ে, নইলে এগোব কী করে।

পঞ্জাওরে ভাই, কী বলে এরা। এগোবে! অম্লানমুখে ব’লে বসল, এগোব।

রাজপুত্রনইলে চলা কিসের জন্যে।

ছক্কাচলা! চলবে কেন তুমি! চলবে নিয়ম।

গান

চলো   নিয়ম-মতে।

দূরে   তাকিয়ো নাকো, ঘাড়    বাঁকিয়ে নাকো, চলো   সমান পথে।

রাজপুত্রহেরো অরণ্য ওই, হোথা    শৃঙ্খলা কই, পাগল ঝরনাগুলো দক্ষিণ পর্বতে।

তাসের দলওদিকে চেয়ো না চেয়ো না, যেয়ো না যেয়ো না—

চলো   সমান পথে॥

পঞ্জাআর নয়, ঐ আসছেন রাজাসাহেব, আসছেন রানীবিবি। এইখানে আজ সভা। এই নাও ভুঁইকুমড়োর ডাল একটা করে।

রাজপুত্রভুঁইকুমড়োর ডাল? হা হা হা হা— কেন।

পঞ্জাচুপ। হেসো না, নিয়ম। বোসো ঈশান কোণে মুখ ক’রে, খবরদার বায়ুকোণে মুখ ফিরিয়ো না।

রাজপুত্রকেন।

ছক্কানিয়ম।

রাজা রানী টেক্কা গোলাম প্রভৃতির যথারীতি যথাভঙ্গিতে প্রবেশ

রাজপুত্রওহে ভাই, স্তবগান করে রাজাকে খুশি করে দিই। তুমি ভুঁইকুমড়োর ডালটা দোলাও।

গান

জয় জয় তাসবংশ-অবতংস, তন্দ্রাতীরনিবাসী, সব-অবকাশ ধ্বংস।

তাসের দলভ্যাস্তা ভ্যাস্তা ভ্যাস্তা! অকালে সভা দিলে ভেঙে, বর্বর!

রাজাশান্ত হও, এরা কারা।

ছক্কাবিদেশী।

চিঁড়েতন, হর্তন, ইস্কাবন— Chiretan hartan iskaban গানটি দেখুন
চিঁড়েতন হর্তন ইস্কাবন

অতি সনাতন ছন্দে  কর্তেছে নর্তন।

কেউ বা ওঠে কেউ পড়ে,

কেউ বা একটু নাহি নড়ে,

কেউ শুয়ে শুয়ে ভুঁয়ে   করে কালকর্তন॥

নাহি কহে কথা কিছু–

একটু না হাসে,   সামনে যে আসে

চলে তারি পিছু পিছু।

বাঁধা তার পুরাতন চালটা,

নাই কোনো উল্টা-পাল্টা– নাই পরিবর্তন॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Chireton, haratan, iskaban -
Oti sanatan chhande  kortechhe nartan.
Keu-ba otthe, keu pare,
Keu-ba ektu naahi nare,
Keu shuye shuye bhnuye kare kaalkartan.
Naahi kahe katha kichu -
Ektu na haase,  saamne je aase
Chale taari pichhu pichhu.
Bandha taar puraton chaalta,
Naai kono ulta-paalta -   naai poribartan.

রাজাওহে বিদেশী

রাজপুত্রকী রাজাসাহেব।

রাজাকে তুমি।

রাজপুত্রআমি সমুদ্রপারের দূত।

গোলামভেট এনেছ কী।

রাজপুত্রএ দেশে সব চেয়ে যা দুর্লভ, তাই এনেছি।

গোলামসেটা কী শুনি।

রাজপুত্রউৎপাত।

ছক্কাশুনলে তো রাজাসাহেব, কথাটা তো শুনলে? লোকটা এগোতে চায়, বললে বিশ্বাস করবে না, লোকটা হাসে। দুদিনে এখানকার হাওয়া দেবে হালকা করে।

গোলামএখানকার হাওয়া যেমন স্থির, যেমন ভারী, এমন কোনো গ্রহে নেই। ইন্দ্রের বিদ্যুৎ পর্যন্ত একে নাড়া দিতে পারে না, অন্যে পরে কা কথা।

সকলে(একবাক্যে) অন্যে পরে কা কথা।

গোলামলঘুচিত্ত বিদেশী এই হাওয়াকে যদি হালকা করে তা হলে কী হবে।

রাজাসেটা চিন্তার বিষয়।

সকলেসেটা চিন্তার বিষয়।

গোলামহালকা হাওয়াতেই ঝড় আসে। ঝড় এলেই নিয়ম যায় উড়ে। তখন আমাদের পুরুত-ঠাকুর নহলা গোস্বামী পর্যন্ত বলতে শুরু করবেন, আমরা এগোব।

পঞ্জাএমন-কি, ভগবান না করুন, হয়তো এখানে হাসিটা সংক্রামক হয়ে উঠবে।

রাজাওহে ইস্কাবনের গোলাম।

গোলামকী রাজাসাহেব।

সকলেকৃষ্টি, কৃষ্টি, কৃষ্টি।

রাজাতোমার পত্রে সম্পাদকীয় স্তম্ভ আছে তো?

গোলামদুটো বড়ো বড়ো স্তম্ভ।

রাজাসেই স্তম্ভের গর্জনে সবাইকে স্তম্ভিত করে দিতে হবে। এখানকার বায়ুকে লঘু করা সইব না।

গোলামবাধ্যতামূলক আইন চাই।

রাজাওটা আবার কী বললে! বাধ্যতামূলক আইন!

গোলামকানমলা আইনের নব্য ভাষা। এও নবতম অবদান।

রাজাআচ্ছা, পরে হবে। বিদেশী, তোমার কোনো আবেদন আছে?

রাজপুত্রআছে, কিন্তু তোমার কাছে নয়।

রাজাকার কাছে।

রাজপুত্রএই রাজকুমারীদের কাছে।

রাজাআচ্ছা, বলো।

রাজপুত্র

গান

ওগো, শান্ত পাষাণমুরতি সুন্দরী, চঞ্চলেরে হৃদয়তলে লও বরি।

কুঞ্জবনে এসো একা, নয়নে অশ্রু দিক দেখা, অরুণরাগে হোক রঞ্জিত বিকশিত বেদনার মঞ্জরী॥

গোলামকানমলা মোচড়ের আইন।

রাজাবুঝেছি। রানীবিবি, তোমার কী মত। বাধ্যতামূলক আইন এবার তবে চালাই?

রানীবাধ্যতামূলক আইন অন্দরমহলে আমরাও চালিয়ে থাকি— দেখব, কে দেয় কাকে নির্বাসন।

টেক্কাকুমারীরা। (সকলে) আমরা চালাব অবাধ্যতামূলক বে-আইন।

গোলামএ কী হল। হায় কৃষ্টি, হায় কৃষ্টি, হায় কৃষ্টি।

রাজাসভা ভেঙে দিলুম। এখনি সবাই চলে এসো। আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়।

[তাসের দলের প্রস্থান

সদাগরভাই সাঙাত, এখানে তো আর সহ্য হচ্ছে না। এরা যে বিধাতার ব্যঙ্গ। এদের মধ্যে প’ড়ে আমরা সুদ্ধ মাটি হয়ে যাব।

রাজপুত্রভিতরে ভিতরে কী ঘটছে, সেটা কি তোমার চোখে পড়ে না। পুতুলের মধ্যে প্রথম প্রাণের সঞ্চার কি অনুভব করছ না। আমি তো শেষ পর্যন্ত না দেখে যাচ্ছি নে।

সদাগরকিন্তু, এ যে জীবন্মৃতের খাঁচা, নিয়মের জারকরসে জীর্ণ এদের মন।

রাজপুত্রঐ দিকে চোখ মেলে দেখো দেখি।

সদাগরতাই তো, বন্ধু, লেগেছে সমুদ্রপারের মন্ত্র। ইস্কাবনের নহলা গাছের তলায় পা ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে, দেখছি এখানকার নিয়ম গেল উড়ে।

রাজপুত্রচিঁড়েতনীর পায়ের শব্দ শুনছে আকাশ থেকে। এ সময়ে বোধ হয় আমাদের সঙ্গটা ওর পছন্দ হবে না। চলো, আমরা সরে যাই।

[ প্রস্থান

তৃতীয় দৃশ্য প্রসাধনে রত ইস্কাবনী। টেক্কানীর প্রবেশ

টেক্কানী

বলো সখী, বলো তারি নাম Bolo sakhi bolo গানটি দেখুন
বলো সখী, বলো তারি নাম

আমার কানে কানে।

     যে নাম বাজে তোমার প্রাণের বীণার

তানে তানে॥

বসন্তবাতাসে বনবীথিকায়

         সে
নাম মিলে যাবে

বিরহীবিহঙ্গকলগীতিকায়।

সে নাম মধুর হবে যে বকুলঘ্রাণে॥

নাহয় সখীদের মুখে মুখে

     সে নাম দোলা খাবে সকৌতুকে।

পূর্ণিমারাতে একা যবে

অকারণে মন উতলা হবে

       সে
নাম শুনাইব গানে গানে॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Balo sokhi, balo taari naam
Aamar kaane kaane
Je naam baaje tomar
Praaner beenar taane taane.
Basontobaatase  bonobeethikay
Se naam mile jaabe
Birahi bihango-kalogeetikay,
Se naam modiro hobe je bokulghraane.
Nahoy sokhider mukhe mukhe
Se naam dola khaabe sakoutuke.
Purnimaaraate eka jaabe
Aakarane mon utala hobe
Se naam shunaibo gaane gaane.

ইস্কাবনীভাই, এ কী হল বলো তো এই তাসের দেশে। ঐ বিদেশীরা কী খ্যাপামির হাওয়া নিয়ে এল। মনটা কেবলই টলমল করছে।

টেক্কানীহাঁ, ভাই ইস্কাবনী, আর দুদিন আগে কে জানত তাসেরা আপন জাত খুইয়ে ঠিক যেন মানুষের মতো চালচলন ধরবে। ছি ছি, কী লজ্জা।

ইস্কাবনীবলো তো, ভাই, মানুষপনা, এ-যে অনাচার। এ কিন্তু শুরু করেছে তোমাদের ঐ হরতনী। দেখিস নি? আজকাল ওর চলন ঠিক থাকে না একেবারে হুবহু মানুষের ভঙ্গি। কার পাশে কখন দাঁড়াতে হবে তারও সমস্ত ভুল হয়ে যায়, পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে। তাসের দেশের নাম ডোবালে।

চিঁড়েতনীর প্রবেশ

চিঁড়েতনীকী গো টেক্কাঠাকরুন, শুনেছি, আমাদের নিন্দে রটিয়ে বেড়াচ্ছ। বলছ, আমরা আচার খুইয়ে, ওঠবার বেলায় বসি, বসবার বেলায় উঠি।

টেক্কানীতা, সত্যি কথা বলেছি, দোষ হয়েছে কী। ঐ-যে তোমার গাল দুটি টুকটুক করছে, রঙ্গিনী, সে কোন্ রঙে। আর, ঐ-যে তোমার ভুরুর ভঙ্গিমা, ধার করেছ কোন্ বিদেশী অমাবস্যার কাজললতা থেকে। এটা তো সাতজন্মে তাসের দেশের শাস্তরে লেখে না। তুমি কি ভাব’, এ কারো চোখে পড়ে না।

চিঁড়েতনীমরে যাই! আর, তুমি যে তোমার ঐ সখীটিকে নিয়ে বকুলতলায় বসে দিনরাত কানে কানে ফিস্-ফিস্ করছ, এটাই কি তাসের দেশের শাস্ত্রে লেখে না কি। ওদিকে-যে গোলাম বেচারা তার জুড়ি পায় না, মরে হায়-হায় ক’রে।

ইস্কাবনীআহা, গুরুঠাকরুন, উপদেশ দিতে হবে না। চুলে যে রাঙা ফিতেটা জড়িয়েছ ঐ ফিতে দিয়ে তাসের দেশের আচার বিচার গলায় দড়ি দিয়ে মরবে। এতবড়ো বেহায়াগিরি তাসরমণী হয়ে!

চিঁড়েতনীতা,হয়েছে কী। আমি ভয় করি নে কাউকে, তোমাদের মতো লুকোচুরি আমার স্বভাব নয়। ঐ-যে তোমাদের দহলানী সেদিন আমাকে মানবী ব’লে টিটকারি দিতে এসেছিল, আমি তাকে পষ্ট জবাব দিয়েছি, তোমাদের তাসিনী হয়ে মরে থাকার চেয়ে মানবী হতে পারলে বেঁচে যেতুম।

ইস্কাবনীঅত গুমোর কোরো না গো কোরো না— জান? তোমাকে জাতে ঠেলবে বলে কথা উঠেছে।

চিঁড়েতনীতাসের জাত তো, আমি তা নিজের হাতে জলাঞ্জলি দিয়েছি, আমাকে ভয় দেখাবে কিসে।

ইস্কাবনীসর্বনাশ! এমন ধাষ্টমির কথা তো সাত জন্মে শুনি নি। উনি ঢাক পিটিয়ে মানবী হতে চলেছেন। চল্ ভাই, টেক্কারানী, কে কোথা থেকে দেখবে, ওর সঙ্গে কথা কচ্ছি, আমাদের সুদ্ধ মজাবে।

চতুর্থ দৃশ্য শ্রীমতী হরতনী টেক্কার প্রবেশ

হরতনীগান

আমি ফুল তুলিতে এলেম বনে Ami phul tulite alem গানটি দেখুন
আমি   ফুল তুলিতে এলেম বনে–

জানি নে,   আমার   কী ছিল মনে।

এ তো ফুল তোলা নয়,   বুঝি নে কী মনে হয়,

জল ভরে যায় দু নয়নে॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Aami phul tulite elem bone -
Jaani ne, aamar   ki chhilo mone.
E to phul tola noy,    bujhi ne ki mone hoy,
Jal bhore jaay du nayone.

রুইতনের সাহেবের প্রবেশ

রুইতনএ কী, হরতনী তুমি এখানে? খুঁজতে খুঁজতে বেলা হয়ে গেল যে।

হরতনীকেন, কী হয়েছে, কী চাই।

রুইতনতোমাকে ডাক পড়েছে রাজসভার গরাবুমণ্ডলে।

হরতনীবলো গে, আমি হারিয়ে গেছি।

রুইতনহারিয়ে গেছ?

হরতনীহাঁ, হারিয়ে গেছি, যাকে খুঁজছ তাকে আর খুঁজে পাবে না, কোনোদিনই।

রুইতনএ কী কাণ্ড। এ কী দুঃসাহস। এই বনে এসেছ তুমি? জান না— নিয়ম নেই?

হরতনীনিয়ম তো নেই, কিন্তু কার নিয়মে বর্ষাবিহীন তাসের দেশে আজ এমন ঘনঘটা। হঠাৎ সকালে উঠেই দেখি, নীল মেঘ আকাশ জুড়ে। এতদিন তোমাদের দেশের ময়ূর গুনে গুনে পা ফেলত, নাচত সাবধানে, আজ কেন এমন অনিয়মের নাচ নাচল, সমস্ত পেখম ছড়িয়ে দিয়ে।

রুইতনকিন্তু, ঘর হতে যার আঙিনা বিদেশ, সেও আজ ফুল তুলতে বেরিয়েছে— এতবড়ো অদ্ভূত কাজ তোমার মাথায় এল কী করে।

হরতনীহঠাৎ মনে হল, আমি মালিনী, আর-জন্মে ফুল তুলতেম। আজ পুবে হাওয়ায় সেই জন্মের ফুলবাগানের গন্ধ এল। সেই জন্মের মাধবীবন থেকে ভ্রমর এসেছে মনের মধ্যে।

গান

ঘরেতে ভ্রমর এল গুন্‌গুনিয়ে Gharete bhromor elo গানটি দেখুন
ঘরেতে   ভ্রমর এল   গুন্গুনিয়ে।

আমারে   কার কথা সে   যায় শুনিয়ে॥

আলোতে   কোন্ গগনে
মাধবী   জাগল বনে,

       এল
সেই   ফুল-জাগানোর খবর নিয়ে।

       সারা
দিন   সেই কথা সে যায় শুনিয়ে॥

কেমনে   রহি ঘরে,   মন
যে কেমন করে–

কেমনে   কাটে যে দিন   দিন গুনিয়ে।

       কী
মায়া   দেয় বুলায়ে,   দিল সব   কাজ
ভুলায়ে,

       বেলা
যায়  গানের সুরে জাল বুনিয়ে।

আমারে    কার কথা সে যায় শুনিয়ে॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Gharete    bhromor elo gunguniye
Aamare     kaar katha se jaay shuniye.
Aalote    kon gagone    maadhobi jaaglo bone,
Elo sei     phul-jaaganor khabor niye.
Saara din     sei katha se jaay shuniye.
Kemone     rohi ghore mon je kemon kore,
Kemone     kaate je din din guniye.
Ke maaya     dey bulaye,   dilo sab    kaaj bhulaye,
Bela jaay     gaaner sure jaal buniye.
Aamare     kaar katha se jaay shuniye.

রুইতনআচ্ছা, গরাবুমণ্ডলের জন্যে বিবিসুন্দরীদের খুঁজে বেড়াচ্ছি, তারাও কি তবে—

হরতনীহাঁ, তারাও এইখানেই, নদীর ধারে ধারে, গাছের তলায় তলায়।

রুইতনকী করছে।

হরতনীসাজ বদল করছে, আমারই মতো। কেমন দেখাচ্ছে। পছন্দ হয়?

রুইতনমনে হচ্ছে, পর্দা খুলে গেছে, চাঁদের থেকে মেঘ গেছে সরে, একেবারে নতুন মানুষ।

হরতনীতোমাদের ছক্কা পঞ্জা আমাদের শাসাবার জন্যে এসেছিলেন, তাঁদের কী দশা হয়েছে দেখো গে যাও।

রুইতনকেন। কী হল।

হরতনীখ্যাপার মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলছে, এমন-কি গুন্-গুন্ করে গানও করছে।

রুইতনগান! ছক্কা-পঞ্জার গান!

হরতনীসুরে না হোক, বেসুরে। আমি তখন চুল বাঁধছিলুম। থাকতে পারলুম না, চলে আসতে হল।

রুইতনআশ্চর্য করলে। চুল বাঁধা! এ বিদ্যে কে শেখালে।

হরতনীকেউ না। ঐ দেখো-না, এবার হঠাৎ শুকনো ঝরনায় নামল বর্ষা। জলের ধারায় ধারায় শুরু হল বেণীবন্ধন। এ বিদ্যা কে শেখাল তাকে। চলো আমার সঙ্গে, ছক্কা-পঞ্জার গান শুনিয়ে দিই তোমাকে।

[প্রস্থান

বিবিদের প্রবেশ

বিবিরা।                                        নাচ ও গান অজানা সুর কে দিয়ে যায় কানে কানে, ভাবনা আমার যায় ভেসে যায় গানে গানে।

বিস্মৃত জন্মের ছায়ালোকে হারিয়ে-যাওয়া বীণার শোকে কেঁদে ফিরে পথহারা রাগিণী।

কোন্ বসন্তের মিলনরাতে তারার পানে ভাবনা আমার যায় ভেসে যায় গানে গানে॥

[প্রস্থান

রুইতন-হরতনীর পুনঃপ্রবেশ

রুইতনদোষ দেব কাকে। আমারই গাইতে ইচ্ছা করছে।

হরতনীদেখো, সম্পাদক যেন শুনতে না পায়, স্তম্ভে চড়াবে। সে দেখলুম ঘুরে বেড়াচ্ছে এই বনের খবর নিতে।

রুইতনদেখো, হরতনী, ভয় কিন্তু আমার গেছে ঘুচে, কেন কী জানি। একটা কিছু হুকুম করো, তোমার জন্যে দুঃসাধ্য কিছু একটা করতে চাই।

হরতনীআর যাই কর গান গেয়ো না, বনে জবা ফুটেছে, তুলে এনে দাও। ফুলের রস দিয়ে রাঙাব পায়ের তলা।

রুইতনদেখো, সুন্দরী, আজ সকালে উঠেই বুঝেছি, আমাদের এই তাসজন্মটা স্বপ্ন। সেটা হঠাৎ ভাঙল। আমাদের আর-এক জন্ম বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তারই বাণী আসছে মুখে, তারই গান শুনছি কানে। ঐ শোনো, ঐ শোনো, আমার সেই যুগের রচিত গান আকাশ থেকে ঐ কে বয়ে আনছে।

গান

তোমার   পায়ের তলায় যেন গো রঙ লাগে, আমার   মনের বনের ফুলের রাঙা রাগে।

যেন   আমার গানের তানে তোমায়   ভূষণ পরাই কানে, যেন     রক্তমণির হার গেঁথে দিই প্রাণের অনুরাগে॥

হরতনীএ গান কোনোদিন তুমিই বেঁধেছিলে, আর আমারই জন্যে? কেমন করে বাঁধলে।

রুইতনযেমন করে তুমি বাঁধলে বেণী।

হরতনীআচ্ছা, মনে কি আসছে, তোমার গানে আমি নেচেছিলুম কোনো-একটা যুগে।

রুইতনমনে আসছে, আসছে। এতদিন ভুলে ছিলুম কী করে তাই ভাবি।

গান

উতল হাওয়া লাগল আমার গানের তরণীতে।

দোলা লাগে, দোলা লাগে তোমার    চঞ্চল ওই নাচের লহরীতে।

যদি কাটে রসি, যদি   হাল পড়ে খসি, যদি   ঢেউ উঠে উচ্ছ্বসি, সম্মুখেতে মরণ যদি জাগে, করি নে ভয়, নেবই তারে নেবই তারে জিতে।

রুইতনদেখো হরতনী, মন ছট্ফটিয়ে উঠেছে যমরাজের সঙ্গে পাল্লা দিতে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ছবি, তুমি পরিয়ে দিলে আমার কপালে জয়তিলক, আমি বেরলুম বন্দিনীকে উদ্ধার করতে, বন্ধ দুর্গের দ্বারে বাজালুম আমার ভেরী। কানে আসছে বিদায়কালে যে গান তুমি গেয়েছিলে।

গান

বিজয়মালা এনো আমার লাগি।

দীর্ঘ রাত্রি রইব আমি জাগি।

চরণ যখন পড়বে তোমার মরণকুলে বুকের মধ্যে উঠবে আমার পরান দুলে, সব যদি যায় হব তোমার সর্বনাশের ভাগী॥

হরতনীচলো চলো, বীর, মরণ পণ করে বেরিয়ে পড়ি দুজনে মিলে। দেখতে পাচ্ছি যে, সামনে কী যেন কালো পাথরের ভ্রূকুটি, ভেঙে চুরমার করতে হবে। ভেঙে মাথায় যদি পড়ে পড়ুক। পথ কাটতে হবে পাহাড়ের বুক ফাটিয়ে দিয়ে। কী করতে এসেছি এখানে। ছি ছি, কেন আছি এখানে। একি অর্থহীন দিন, কী প্রাণহীন রাত্রি। কী ব্যর্থতার আবর্তন মুহূর্তে মুহূর্তে।

দহলাঅর্থ নেই— নিয়ম।

ছক্কানিয়ম যদি নাই মানি?

দহলাঅধঃপাতে যাবে।

ছক্কাযাব সেই অধঃপাতেই।

দহলাকী করতে।

পঞ্জাসেখানে যদি অগৌরব থাকে তার সঙ্গে লড়াই করতে।

দহলাএ কেমন গোঁয়ারের কথা শান্তিপ্রিয় দেশে!

পঞ্জাশান্তিভঙ্গ করব পণ করেছি।

হরতনীর প্রবেশ

দহলাশুনছ, শ্রীমতী হরতনী? এরা শান্তি ভাঙতে চায় আমাদের এই অতলস্পর্শ প্রশান্তমহাসাগরের ধারে।

হরতনীআমাদের শান্তিটা বুড়ো গাছে মতো। পোকা লেগেছে ভিতরে ভিতরে, সেটা নির্জীব, তাকে কেটে ফেলা চাই।

দহলাছি ছি ছি ছি, এমন কথা তোমার মুখে বেরোল! তুমি নারী, রক্ষা করবে শান্তি; আমরা পুরুষ রক্ষা করব কৃষ্টি।

হরতনীঅনেকদিন তোমরা আমাদের ভুলিয়েছ, পণ্ডিত। আর নয়, তোমাদের শান্তিরসে হিম হয়ে জমে গেছে আমাদের রক্ত, আর ভুলিয়ো না।

দহলাসর্বনাশ! কার কাছ থেকে পেলে এ-সব কথা।

হরতনীমনে মনে তাকেই তো ডাকছি। আকাশে শুনতে পাচ্ছি তারই গান।

দহলাসর্বনাশ। আকশে গান! এবার মজল তাসের দেশ। আর এখানে নয়।

[ প্রস্থান

ছক্কাসুন্দরী, তুমিই আমাদের পথ দেখাও।

পঞ্জাঅশান্তিমন্ত্র পেয়েছ তুমি, সেই মন্ত্র দাও আমাদের।

হরতনীবিধাতার ধিক্কারের মধ্যে আছি আমরা, মূঢ়তার অপমানে। চলো, বেরিয়ে পড়ি।

ছক্কাএকটু নড়লেই যে ওরা দোষ ধরে, বলে ‘অশুচি’।

হরতনীদোষ হয় হোক, কিন্তু মরে থাকার মতো অশুচিতা নেই।

[ প্রস্থান

ইস্কাবনী ও টেক্কানী ফুল তুলছে

টেক্কানীঐ-রে, দহলানী এসেছে। আর রক্ষে নেই।

দহলানীর প্রবেশ

দহলানীলুকোচ্ছ কোথায়। কে গো, চেনা যায় না যে! এ-যে আমাদের টেক্কানী। আর, উনি কে, উনি যে আমাদের ইস্কাবনী। মরে যাই। কী ছিরি করেছ! মানুষ সেজেছ বুঝি? লজ্জা নেই?

টেক্কানীসাজি নি, দৈবাৎ সাজ খসে পড়েছে।

দহলানীতাসের দেশের বন্ধন আঁট বন্ধন— হাজার বছরের হাজার গিরে দেওয়া খসে পড়ল? কাণ্ডটা ঘটল কী ক’রে।

ইস্কাবনীএকটা হাওয়া দিয়েছিল।

দহলানীওমা, কী বলো গো। তাসের দেশের হাওয়ায় বাঁধন ছেঁড়ে! আমাদের পবনদেবের নামে এত বড়ো বদনাম। বলি, এ কি মেলেচ্ছ দেশ পেয়েছ, যেখানে একটু হাওয়া দিলেই গাছের শুকনো পাতা খসে উড়ে যায়।

ইস্কাবনীস্বচক্ষেই দেখো-না, দিদি, কী বদল ঘটিয়েছেন আমাদের পবনদেব!

দহলানীদেখো, ছোটো মুখে বড়ো কথা ভাল নয়। আমাদের সনাতন পবনদেব! তবে কিনা পুঁথিতে লিখছে তাঁর এক মহাবীর পুত্র আছেন, তিনি নাকি লম্বা লম্বা লম্ফ দিয়ে বেড়ান। হয়তো বা তিনিই ভর করেছেন তোমাদের ‘পরে।

টেক্কানীকেবল আমাদের খোঁটা দিচ্ছ কেন। এখনো চোখে বুঝি পড়ে নি? তিনি যে লম্ফ লাগিয়েছেন তাসের দেশময়। তাসিনীদের বুকে আগুন লাগিয়ে বেড়াচ্ছেন।

ইস্কাবনীসাগরপারের মানুষরা বলছে, তিনিই নাকি ওদের পূর্বপুরুষ।

দহলানীহতে পারে— ওরা লাফ-মারা-বংশেরই সন্তান।

টেক্কানীআচ্ছা, সত্যি কথা বলো দিদি— ভিতরে ভিতরে তোমারও মন চঞ্চল হয়েছে? না, চুপ করে থাকলে চলবে না।

দহলানীকাউকে বলে দিবি নে তো?

টেক্কানীতোমার গা ছুঁয়ে বলছি, কাউকে বলব না।

দহলানীকাল ভোর রাত্তিরের ঘুমে স্বপ্ন দেখলুম, হঠাৎ মানুষ হয়ে গেছি, নড়েচড়ে বেড়াচ্ছি ঠিক ওদেরই মতো। জেগে উঠে লজ্জায় মরি আর কি। কিন্তু—

টেক্কানীকিন্তু কী।

দহলানীসে কথা থাক্ গে।

ইস্কাবনীবুঝেছি, বুঝেছি, দিনের বেলাকার বাঁধা পাখি খোলা পেয়েছিল স্বপ্নে।

দহলানীচুপ চুপ চুপ, নহলাপণ্ডিত শুনলে স্বপ্নেরও প্রায়শ্চিত্ত লাগিয়ে দেবে। ওটা পাপ যে। কিন্তু, স্বপ্নে কী ফুর্তি।

টেক্কানীযা বলিস, ভাই, তাসের দেশে সাগরপারের হাওয়া দিয়েছে খুব জোরে। কিছু যেন ধরে রাখতে পারছি নে, সব দিচ্ছে উড়িয়ে।

দহলানীতা হোক, এখনো কিন্তু কিছু উড়ল, কিছু রইল বাকি। মাথার ঘোমটা যদি বা খসল, পায়ের বাঁক-মল তো সোজা করতে পারল না।

ইস্কাবনীসত্যি বলেছিস, মনটা সমুদ্রের এপারে ওপারে দোলাদুলি করছে। ঐ দেখ্-না, চিঁড়েতনীর মানুষ হবার অসহ্য শখ, পারে না, তাই মানুষের মুখোশ পরেছে— সেটা তাসমহলেরই কারখানাঘরে তৈরি। কী অদ্ভুত দেখতে হয়েছে।

দহলানীআমাদের কাকে কী রকম দেখতে হয়েছে নিজেরা বুঝতেই পারি নে। গাছের আড়াল থেকে কাল শুনলুম, সদাগরের পুত্তুর বলছিল, এরা যে মানুষের সঙ সাজছে।

টেক্কানীওমা, কী লজ্জা। রাজপুত্তুর কী বললেন।

দহলানীতিনি রেগে উঠে বললেন, সে তো ভালোই— সাজের ভিতর দিয়ে রুচি দেখা দিল। তিনি বললেন, এ দেখে হেসো না, হাসতে চাও তো যাও তাদের কাছে মানুষের মধ্যে যারা তাসের সঙ সেজে বেড়ায়।

ইস্কাবনীওমা, তাও কি ঘটে নাক। মানুষ হয়ে তাসের নকল! আচ্ছা, কী করে তারা।

দহলানীরাজপুত্তুর বলছিলেন, তারা রঙের কাঠি বুলোয় ঠোঁটে, কালো বাতি দিয়ে আঁকে ভুরু, আরো কত কী, আমাদের রঙ-করা তাসেদেরই মতো। সব চেয়ে মজার কথা, ওরা খুরওয়ালা চামড়া লাগায় পায়ের তলায়।

টেক্কানীকেন।

দহলানীপদোন্নতি ঘটে, মাটিতে পা পড়ে না। এ-সমস্তই তাসের ঢঙ। এঁকে দেওয়া, সাজিয়ে দেওয়া কায়দা।

ইস্কাবনীএ তো দেখি পবনদেবের উলটোপালটা খেলা— তাসীরা হতে চায় রঙ খসিয়ে মানুষ, মানুষ চায় রঙ মেখে তাসী হতে। আমি কিন্তু, ভাই, ঠিক করেছি, মানুষের মন্তর নেব রাজপুত্তুরের কাছে।

টেক্কানীআমিও।

দহলানীআমারও ইচ্ছে করে, কিন্তু ভয়ও করে। শুনেছি মানুষের দুঃখ ঢের, তাসের কোনো বালাই নেই।

ইস্কাবনীদুঃখের কথা বলছিস, ভাই? দুঃখ যে এখনি শুরু করেছে তার নৃত্য বুকের মধ্যে।

টেক্কানীকিন্তু, সেই দুঃখের নেশা ছাড়তে চাই নে। থেকে থেকে চোখ জলে ভেসে যায়, কেন যে ভেবেই পাই নে।

গান

কেন   নয়ন আপনি ভেসে যায়, মন কেন এমন করে—

যেন    সহসা কী কথা মনে পড়ে, মনে   পড়ে না গো, তবু মনে পড়ে।

যেন   কাহার বচন দিয়েছে বেদন, যেন    কে চলে গিয়েছে অনাদরে—

বাজে    তারি অযতন প্রাণের ‘পরে।

যেন  সহসা কী কথা মনে পড়ে, মনে    পড়ে না গো, তবু মনে পড়ে।

ইস্কাবনীপালাও পালাও, সম্পাদক আসছে। কাগজে যদি রটে যায় তা হলে মুখ দেখাতে পারব না।

দহলানীঐ-যে দলবল সবাই আসছে। বুড়োনিমতলায় আজ সভা বসবে। এখানে আর নয়।

[প্রস্থান

রাজাসাহেব প্রভৃতির প্রবেশ

রাজাএ জায়গাটা কেমন ঠেকছে। ওটা কিসের গন্ধ।

পঞ্জাকদম্বের।

রাজাকদম্ব! অদ্ভুত নাম। ওটা কী পাখি ডাকছে।

পঞ্জাশুনেছি, ওকে বলে ঘুঘু।

রাজাঘুঘু! তাসের ভাষায় ওকে একটা ভদ্র নাম দাও, বলো বিন্তি।– আজ তো কাজ করা দায় হয়েছে। আজ আকাশে কথা শোনা যাচ্ছে, বাতাসে সুর উঠেছে। অনেক কষ্টে মনকে শান্ত রেখেছি। রানীবিবিকে তো ঘরে রাখা শক্ত হল, নেচে বেড়াচ্ছে ভূতে-পাওয়ার মতো। সভ্যগণ, তোমাদের আজ চেনা যায় না— সভার সাজ নেই, অত্যন্ত অসভ্যের মতো।

সকলেদোষ নেই। ঢিলে হয়ে গেল আমাদের সাজ, আপনি পড়ল খসে— সেগুলো রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে আছে।

রাজাসম্পাদক, তোমারও যেন গাম্ভীর্যহানি হয়েছে বলে বোধ হচ্ছে।

গোলামসকাল থেকে আছি বনে, পলাতকাদের নাম সংগ্রহ করার জন্যে। এখানকার হাওয়া লেগেছে। সম্পাদকীয় স্তম্ভ ভরাতে গিয়ে দেখি, লেখনী দিয়ে ছন্দ ঝরছে। শুনেছি, আধুনিক ডাক্তার এইরকম নিঃসারণকেই বলে ইন্ফুলুয়েঞ্জা।

রাজাকী রকম, একটা নমুনা দেখি।

গোলামযে দেশে বায়ু না মানে শোনো বিদেশী।

রাজপুত্রআদেশ করো।

রাজাতোমরা যে তাসদ্বীপময় অস্থির হয়ে বেড়াচ্ছ— জলে দিচ্ছ ডুব, চড়ছ পাহাড়ের মাথায়, কুড়ুল হাতে বনে কাটছ পথ— এ-সব কেন।

রাজপুত্ররাজাসাহেব, তোমরা যে কেবলই উঠছ বসছ, পাশ ফিরছ, পিঠ ফেরাচ্ছ, গড়াচ্ছ মাটিতে, সেই বা কেন।

রাজাসে আমাদের নিয়ম।

রাজপুত্রএ আমাদের ইচ্ছে।

রাজাইচ্ছে? কী সর্বনাশ! এই তাসের দেশে ইচ্ছে! বন্ধুগণ, তোমরা সবাই কী বল।

ছক্কা-পঞ্জা। আমরা ওর কাছে ইচ্ছেমন্ত্র নিয়েছি।

রাজাকী মন্ত্র!

ছক্কা-পঞ্জা।

গান

ইচ্ছে।

সেই তো ভাঙছে, সেই তো গড়ছে, সেই তো দিচ্ছে নিচ্ছে।

সেই তো আঘাত করছে তালায়, সেই তো বাঁধন ছিঁড়ে পালায়, বাঁধন পরতে সেই তো আবার ফিরছে॥

রাজাযাও, যাও, এখান থেকে চলে যাও, শীঘ্র চলে যাও। হরতনী, কানে পৌঁছল না কথাটা? চিঁড়েতনী, দেখছ ওর ব্যবহারটা? হঠাৎ এমন হল কেন।

হরতনীইচ্ছে।

অন্য টেক্কারা। ইচ্ছে।

রাজাও কী রানীবিবি, তাড়াতাড়ি উঠে পড়লে যে।

রানীআর বসে থাকতে পারছি নে।

রাজারানীবিব, সন্দেহ হচ্ছে, তোমার মন বিচলিত হয়েছে।

রানীসন্দেহ নেই, বিচলিত হয়েছে।

রাজাজান? চাঞ্চল্য তাসের দেশে সব চেয়ে বড়ো অপরাধ।

রানীজানি, আর এও জানি, এই অপরাধটাই সব চেয়ে বড়ো সম্ভোগের জিনিস।

শান্ত যেই জন যম তারে ঠেলে ঠেলে নেড়েচেড়ে যায় ফেলে; বলে, “মোর নাহি প্রয়োজন”।

রাজাশাস্তির জিনিসকে তুমি বললে ভোগের জিনিস, তাসের দেশের ভাষাও ভুলে গেছ?

রানীআমাদের তাসের দেশের ভাষায় শিকলকে বলে অলংকার, এ ভাষা ভোলবার সময় এসেছে।

রুইতনহাঁ বিবিরানী, এদের ভাষায় জেলখানাকে বলে শ্বশুরবাড়ি।

রাজাচুপ।

হরতনীএরা হেঁয়ালীকে বলে শাস্তর।

রাজাচুপ।

হরতনীবোবাকে বলে সাধু।

রাজাচুপ।

হরতনীবোকাকে বলে পণ্ডিত।

রাজাচুপ।

পঞ্জাএরা মরাকে বলে বাঁচা।

রাজাচুপ।

রানীআর, স্বর্গকে বলে অপরাধ। বলো তোমরা, জয় ইচ্ছের জয়।

সকলেজয় ইচ্ছের জয়।

রাজারানীবিবি, তোমার বনবাস!

রানীবাঁচি তা হলে।

রাজানির্বাসন!— ও কী, চললে যে! কোথায় চললে।

রানীনির্বাসনে।

রাজাআমাকে ফেলে রেখে যাবে?

রানীফেলে রেখে যাব কেন।

রাজাতবে?

রানীসঙ্গে নিয়ে যাব তোমাকে।

রাজাকোথায়।

রানীনির্বাসনে।

রাজাআর এরা, আমার প্রজারা?

সকলেযাব নির্বাসনে।

রাজাদহলাপণ্ডিত কী মনে করছ।

দহলানির্বাসনটা ভালোই মনে করছি।

রাজাআর, তোমার পুঁথিগুলো?

দহলাভাসিয়ে দেব জলে।

রাজাবাধ্যতামূলক আইন?

দহলাআর চলবে না।

সকলেচলবে না, চলবে না।

রানীকোথায় গেল সেই মানুষরা।

রাজপুত্রএই-যে আছি আমরা।

রানীমানুষ হতে পারব আমরা?

রাজপুত্রপারবে, নিশ্চয় পারবে।

রাজাওগো বিদেশী, আমিও কি পারব।

রাজপুত্রসন্দেহ করি। কিন্তু, রানী আছেন তোমার সহায়। জয় রানীর।

ভাঙো বাঁধ ভেঙে দাও Bhango badh bhenge dao গানটি দেখুন
ভাঙো    বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ
ভেঙে দাও।

বন্দী প্রাণ মন হোক উধাও॥

শুকনো গাঙে আসুক

জীবনের বন্যার উদ্দাম কৌতুক–

ভাঙনের জয়গান গাও।

জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক,

যাক ভেসে যাক, যাক ভেসে যাক।

আমরা শুনেছি ওই      মাভৈঃ
মাভৈঃ মাভৈঃ

কোন্ নূতনেরই ডাক।

ভয় করি না অজানারে,

রুদ্ধ তাহারি দ্বারে    দুর্দাড় বেগে ধাও॥

প্রতিবর্ণীকরণ

Bhaango  bnaadh bhenge daao, bnaadh bhenge dao, bnaadh bhenge daao.
Bondi praanomon hok udhaao.
Shukno gaange aasuk
Jibanero bonyar uddam koutuk,
Bhangonero joyogaan gaao.
Jirno puraton jaak bhese jaak,
Jaak bhese jaak, jaak bhese jaak.
Aamra shunechhi oi   maabhoi, maabhoi,maabhoi
Kon nutaneri daak.
Bhoy kori na ajanare,
Ruddho taahari dwaare   durdaro bege dhaao.

উৎস: Rabindra Rachanabali (NLTR)